দেশনিউজ

চিনকে রোখার স্ট্র্যাটেজি কী হবে? মোদীর Bimstec Summit কেন অত্যন্ত তাত্‍পর্যপূর্ণ?

আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আজ থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শুরু হচ্ছে বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (বিমসটেক)-এর ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন। এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের আগে গত ২ এপ্রিল সদস্য দেশগুলির শীর্ষ আধিকারিকদের এবং গতকাল ৩ এপ্রিল বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আজ ব্যাংকক যাবেন।

উল্লেখ্য, এর আগে তিন বছর আগে ২০২২ সালের ৩০ মার্চ শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে বিমসটেকের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের শীর্ষ সম্মেলনের মূল থিম হল ‘সমৃদ্ধ, স্থিতিস্থাপক এবং মুক্তি BIMSTEC’। এই সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য হল বিমসটেকের সাত সদস্য দেশ – বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও জোরদার করা।

এই শীর্ষ সম্মেলনের মূল আকর্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম হল ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন ঘোষণাপত্র গ্রহণ। এছাড়াও, ভবিষ্যৎ সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত রোডম্যাপ ‘ব্যাংকক ভিশন ২০৩০’ গৃহীত হবে। সদস্য দেশগুলির নেতারা বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্য ও ভ্রমণ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবহন সহযোগিতা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

বিমসটেকের লক্ষ্য:

ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন আঞ্চলিক ফোরাম হিসেবে এই সংগঠনের ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাঁচটি দক্ষিণ এশীয় এবং দুটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশকে নিয়ে গঠিত বিমসটেক আঞ্চলিক বিষয়ে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে প্রস্তুত। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সংস্থাটি কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষে মানুষে যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মতো সাতটি প্রধান ক্ষেত্র এবং অর্থনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য সহ আটটি উপ-ক্ষেত্রের ওপর কাজ করছে।

ভারতে বিমসটেকের প্রভাব:

ভারত বিমসটেকের চার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে অন্যতম এবং নিরাপত্তা, জ্বালানি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিমসটেক সচিবালয়ের বাজেটে ভারত সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ অর্থ প্রদান করে। ভারতে বিমসটেকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে – উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় অবস্থিত বিমসটেক আবহাওয়া ও জলবায়ু কেন্দ্র এবং বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত বিমসটেক শক্তি কেন্দ্র। এছাড়াও, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পরিবহনে আরও তিনটি নতুন উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিমসটেককে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা জোরদার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০১৬ সালে গোয়ায় বিমসটেক লিডার্স রিট্রিটের আয়োজন এবং পঞ্চম বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে এক মিলিয়ন ডলার আর্থিক অনুদান ঘোষণা তারই প্রমাণ। ভারত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দ্বিতীয় বিমসটেক বিদেশমন্ত্রীদের রিট্রিট আয়োজন করবে, যেখানে নতুন কেন্দ্র স্থাপন, মহাকাশ সহযোগিতা এবং মানুষে মানুষে মত বিনিময়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হবে। এছাড়াও, নিউইয়র্কে ৭৯তম রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে বিমসটেকের বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকের সভাপতিত্বও করবে ভারত।

চিনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি:

ভারতের ‘ নেবারহুড ফার্স্ট পলিসি’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ এবং ‘সাগর’ (অঞ্চলে সকলের জন্য নিরাপত্তা এবং বৃদ্ধি) – এই নীতিগুলি বিমসটেক দেশগুলির সঙ্গে ভারতের দৃঢ় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায়। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকায়, ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিমসটেককে একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর ফোরাম হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে, যা এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে সাহায্য করবে।

সার্কের বিকল্প হিসেবে বিমসটেক:

পাকিস্তান সহ অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কারণে সার্ক (SAARC) বর্তমানে একটি নিষ্ক্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন দেশগুলির উপর চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা এবং তার সম্প্রসারণবাদী নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারত যদি এই প্ল্যাটফর্মটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে সদস্য দেশগুলির পক্ষে চিনকে সমর্থন করা কঠিন হবে এবং এর ফলে ভারত শুধু বিমসটেক নয়, সমগ্র এশিয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিমসটেকের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারত এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সদস্য দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে এবং তাদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, যা চিনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় হলে, তারা চিনের যে কোনও প্রকল্পের আগে ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।

Back to top button